নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশগত স্থায়িত্বের চ্যালেঞ্জবিষয়ক নীতিগত সংলাপ

দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন সক্ষমতা ১.৮ শতাংশ

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও টেকসই নগরায়ণ ত্বরান্বিত করা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং জনকল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ও টেকসই নগরায়ণ ত্বরান্বিত করা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, পরিবেশগত স্থিতিশীলতা এবং জনকল্যাণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নগরের স্থায়িত্ব বাড়ালে শহরগুলো স্বাস্থ্যকর হবে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মক্ষমতা শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪০ শতাংশ হলেও বাংলাদেশের সক্ষমতা মাত্র ১ দশমিক ৮ শতাংশ।

রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে উচ্চ পর্যায়ের নীতিগত সংলাপে এ কথা বলেন বক্তারা। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ এবং ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সংলাপটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই নগর এ দুটি মূল থিমের ওপর ভিত্তি করে অনুষ্ঠিত হয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ক্ষেত্রে শিল্প ও কৃষি খাতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা পর্যালোচনা করা হয়। অন্যদিকে টেকসই নগরের ক্ষেত্রে শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ কীভাবে পরিবেশগত প্রভাব হ্রাস করতে পারে তা বিশ্লেষণ করা হয়। বাংলাদেশে বর্জ্য থেকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রবল সম্ভাবনা থাকলেও আমলাতান্ত্রিক ও নীতিগত জটিলতায় এগোচ্ছে না বলে মনে করেন অংশীজনরা।

এ সময় দুটি প্যানেল আলোচনার মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা পরিবেশ ও জ্বালানির চ্যালেঞ্জ নিয়ে পর্যালোচনা করেন। প্রথম প্যানেলে ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সহযোগী গবেষক ড. মুগ্ধ মহজাব ‘ইভি ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ থেকে সিসা দূষণ এবং চীনের কারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরের প্রভাব’ শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘চীনের কঠোর পরিবেশগত নীতির কারণে দেশটি থেকে ব্যাটারি আমদানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে সিসাযুক্ত ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ বেড়েছে, যা পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে।’

এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. অতনু রাব্বানী ‘বাংলাদেশী কারখানাগুলোয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি গ্রহণের সুযোগ ও প্রতিবন্ধকতা’ বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যয়বহুল ধারণাই মূলত পোশাক শিল্পে এর গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা।’

ড. অতনু রাব্বানী জানান, গার্মেন্ট শিল্পে মাত্র ৭ শতাংশ কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। নারায়ণগঞ্জ ও মানিকগঞ্জের ১০টি কারখানার ওপর পরিচালিত এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে। যদিও এক্ষেত্রে ক্রেতাদের চাহিদা প্রায় ৪২ শতাংশ।’

দ্বিতীয় প্যানেলে ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) গবেষণা পরিচালক ড. মুন্সী সুলাইমান ‘কক্সবাজার পৌরসভায় গৃহস্থালির বর্জ্য পৃথকীকরণ প্রণোদনা’ শীর্ষক একটি পরীক্ষামূলক গবেষণা উপস্থাপন করেন। এতে দেখা গেছে, প্রতিদিন বাংলাদেশে প্রায় চার হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা হয়। এর মধ্যে দুই-তিন হাজার টন অব্যবহৃত থেকে যায়। মাত্র ৪ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়।

এরপর সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মার্টিন ম্যাটসন ‘বায়ুদূষণের ক্ষতি কমাতে প্রতিরক্ষামূলক বিনিয়োগ’ বিষয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতি বছর ১৪ লাখ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে মারা যান। এ ক্ষেত্রে এয়ার পিউরিফায়ার ৮০ শতাংশ কার্যকর হওয়া সত্ত্বেও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোয় এর ব্যবহারের হার খুবই কম।’

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও টেকসই নগর উন্নয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খাতে প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়নের জন্য কমিশন নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

‘টেকসই নগর উন্নয়ন’ বিষয়ক প্যানেল আলোচনাটি পরিচালনা করেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ। অন্যদিকে আইজিসির গবেষণা প্রধান ও বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড শাহিদ ভাজিরালি ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও জ্বালানি প্রবেশাধিকার’ বিষয়ক প্যানেল পরিচালনা করেন।

এছাড়া সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান, এনজিও ফোরাম বাংলাদেশের গবেষণা পরিচালক আহসান হাবিব, গ্রিনবাডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ তাসনিম মাহমুদ এবং সাংবাদিক বাবু কামরুজ্জামান প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।

আরও